ঢাকা, , ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে

জীবনের ঝুঁকি, তবু পাহারায়…

জীবনের ঝুঁকি, তবু পাহারায়…

বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে ভালো চাকরি করবে। কিন্তু অর্থাভাবে বেশি দূর লেখাপড়া করতে পারেননি আনিস (ছদ্ম নাম)। সংসারের ঘানি টানতে পাড়ি জমান ঢাকায়৷ চাকরির খোঁজ করতে গিয়ে কেটে যায় দীর্ঘ সময়। এরপরে বিএফডিসির নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি হয়। চাকরিটাই তার একমাত্র সম্বল। যদি চাকরির কিছু হয়, এই ভয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে প্রথমে কথা বলতেও অস্বীকৃতি জানান তিনি। সবশেষে কথা বলেছেন কিন্তু নাম প্রকাশ না করার শর্তে।

নব্বইয়ের দশকের কথা। তখন ঢাকাই সিনেমার রমরমা সময়। চলচ্চিত্রের আঁতুর ঘর খ্যাত বিএফডিসিতে লাইট, ক্যামেরার ঝলকানি আর পরিচালকের কণ্ঠে ‘অ্যাকশন-কাট’ আর তারায় তারায় মুখরিত ছিল এফডিসি চত্বর। শুটিংয়ের ফাঁকে আড্ডা জমত শিল্পীদের। স্বল্প মাইনের চাকরি হলেও প্রযোজক, পরিচালক আর শিল্পীদের দেওয়া বখশিসে বেশ ভালোই চলতো নিরাপত্তাকর্মীদের।

কোলাহলপূর্ণ সেই এফডিসি এখন অনেকটাই নীরব, নিস্তব্ধ। কালেভাদ্রে সিনেমার শুটিং হয়। এখন আর খ্যাতনামা শিল্পীদের পদচারণায় মুখরিত হয় না এফডিসি। স্বাভাবিক কারণে বখশিসও তাদের ভাগ্যে জোটে না।

আনিস বলেন, ‘এফডিসিতে যখন চাকরি নিয়েছি, তখন ফ্লোরে ফ্লোরে শুটিং চলতো। সেই সময়কার সুপার হিট শিল্পীরা গেটে গাড়ির গ্লাস নামিয়ে বখশিস দিতেন। দু’ একজন তো আমাদের খোঁজ-খবরও নিতেন। সে সময় এমনো হতো দুই-তিন হাজার টাকা পেতাম একদিনে। এখন গেটে কারো গাড়ি থামে না। কেউ খোঁজ-খবরও নেন না। গেটে প্রবেশ করতেই আমরা সালাম দেই। এখন সালামের উত্তর দেওয়ার সময়ও নেই অনেকের।’

তিনি আরো বলেন, ‘বেতনের টাকা দিয়েই সংসার কোনো মতে কষ্ট করে চালাতে হয়৷ এখন মাঝে মাঝে বেতন পেতেও লেট হয়ে যায়। কারণ এফডিসির আয় কমে গেছে। তাই বেতন দিতে দেরি করে।’

অভাব-অনটনে দিনযাপন করছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। এর মধ্যে করোনা আতঙ্ক সারাক্ষণ তাড়া করে আনিসদের।

করোনাভাইরাসের কারণে সরকারি ছুটি ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত। এফডিসির সকল অফিস অনেক আগে থেকেই বন্ধ। জনমানবহীন নীরব-নিস্তব্দ এফডিসি। নেই কোনো সিনেমার শুটিং। চলচ্চিত্রের সংগঠনগুলোর সদস্যদের চায়ের টেবিলে হয় না কথার বাহাস, ক্রেতাদের অপেক্ষায় বসে নেই ঝালমুড়ি বিক্রেতা। এমনকি চলচ্চিত্রের বেকার লোকগুলো কাজের সন্ধানে এখন আর এফডিসির পার্কে অপেক্ষা করে না। কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীরা এখনো নিয়ম করে জনমানবহীন এফডিসি পাহারা দিয়ে যাচ্ছেন।

বর্তমানে এফডিসিতে মোট ১৩ জন নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন। এরা দুই শিফটে বিভক্ত৷ ডিউটি শেষ করে ফিরে যেতে হয় বাসায়। করোনা থেকে নিজেদের সুরক্ষা দিতে তাদের নেই কোনো পিপিই। কোনোরকম সেফটি ছাড়াই নিরাপত্তার কাজ করে যাচ্ছেন তারা। অনেক ঝুঁকি আছে তা যেনেও চাকরি বাঁচানোর ভয়ে রুটিন মেনে কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে আনিস বলেন, ‘চাকরি করতে হলে দায়িত্ব তো পালন করতেই হবে। পরিবারের লোকজন উৎকণ্ঠায় থাকে। তারপরও ডিউটি পালন করছি। এফডিসিতে এখন কেউ আসে না। সবকিছু বন্ধ।’

এ বিষয়ে বিএফডিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা হিমাদ্রী বড়ুয়া বলেন, ‘এফডিসি এখন বন্ধ রয়েছে। সকল সমিতিও বন্ধ। কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীদের ছুটি নেই। তারা শিফট ভাগ করে ডিউটি করছেন। এফডিসির ভেতরে অনেক মূল্যবান মেশিন রয়েছে। এগুলো দেখভাল করার জন্য নিরাপত্তাকর্মীরা রয়েছেন।’

করোনা থেকে সুরক্ষা পেতে তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাদের সুরক্ষার জন্য মাস্ক, সেনিটাইজারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

নিরাপত্তাকর্মীরা বাড়ি ফেরার পথে করোনা বহণ করে বাসায় নিতে পারেন। এতে করে হুমকির মুখে পড়তে পারে তাদের পরিবার।

এফডিসির সকল কার্যক্রম বন্ধ। কোনো লোক যাচ্ছে না সেক্ষেত্রে নিরাপত্তাকর্মীদে গেট খুলে বসে থাকা কতটা যৌক্তিক? এমন প্রশ্ন থেকেই যায়। আপদকালীন এই সময়ে এফডিসিতে নিরাপত্তাকর্মীদের থাকার ব্যবস্থার পাশাপাশি নিজেদের সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র বোদ্ধারা।

  • সর্বশেষ - ঢাকা