ঢাকা, , ২৭ আষাঢ় ১৪২৭ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে

হাসপাতাল ফিরিয়ে দিলে মানুষ যাবে কোথায়

হাসপাতাল ফিরিয়ে দিলে মানুষ যাবে কোথায়

জ্বর-সর্দি-কাশি-শ্বাসকষ্টের রোগীদের নিয়ে স্বজনরা হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটছেন। কিন্তু কোথাও চিকিৎসা মিলছে না।  যেই হাসপাতাল-ক্লিনিকেই রোগী নিয়ে যান স্বজনরা, সেখান থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে ছুটতে ছুটতে কেউ কেউ চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। ভুক্তভোগী ও রোগীর স্বজনরা বলছেন, হাসপাতাল থেকে যদি বিনা চিকিৎসায় ফিরিয়ে দেয়, তাহলে মানুষ কোথায় যাবে?

অভিযোগ রয়েছে, করোনার উপসর্গের  সঙ্গে  জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা ও শ্বাসকষ্টের মতো রোগের লক্ষণ মিলে যায়। এ কারণে  চিকিৎসকরা এসব রোগীরও চিকিৎসা না দিয়ে করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালের দিকে পাঠিয়ে দেন।

এমনই একজন নিউমোনিয়া-রোগী নারায়ণগঞ্জের চিত্তরঞ্জন ঘোষ। ৬০ বছর বয়সী এই রোগীকে নিয়ে শুক্রবার (৩ এপ্রিল) স্বজনরা রাজধানীর একাধিক হাসপাতালে নিয়েও ভর্তি করাতে পারেননি।  

এই প্রসঙ্গে সন্ধ্যা  সাড়ে ৭ টায় চিত্তরঞ্জন ঘোষের ছেলে মিলটন ঘোষ বলেন, ‘বাবার জ্বর-সর্দি-কাশি। আমরা তাকে প্রথমে একটি নাম করা হাসপাতালে  নিয়ে যাই। সেখানে ডাক্তাররা চিকিৎসা না দিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলেন। এখানে আসার পর জরুরি বিভাগের ডাক্তারা বলেন, শুক্রবার করোনা পরীক্ষার ল্যাব বন্ধ। এ কারণে আমাদের  একটি হাসপাতালে যেতে বলেন। আমরা রাজধানীর আরেকটি হাসপাতালে যাই। সেখানেও তারা রোগী গ্রহণ করেননি। তারা আমাদের  মিডফোর্ট (স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ) হাসপাতালে যেতে বলেন। এখন সেখানেই যাচ্ছি।’

রোগী ভর্তি না করানোর বিষয়ে জানতে ঢামেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার এ কে এম নাসির উদ্দীন একাধিকবার মোবাইলফোনে কল দিলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। এসএমএস পাঠালেও এসএমএস দিয়েও শুক্রবার (৩ এপ্রিল) রাত ১০ টা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

এদিকে, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে বিনা চিকিৎসায় মারা যায় খুলনার খালিশপুর হাউজিং বিহারি ক্যাম্প-এর বাসিন্দা মো. কাশেমের ছেলে লিভার সিরোসিসের রোগী রিফাত। এই প্রসঙ্গে শিশুটির নানা মো. কলিমুদ্দীন বলেন, ‘নাতিকে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বেলা আড়াইটার দিকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে তাকে ভর্তি নেয়নি। কাগজে ওষুধ লিখে খাওয়ানোর জন্য বলা হয়। বেশি সমস্যা হলে বুধবার হাসপাতালে নিতে বলা হয়।’

রিফাতের নানা আরও বলেন, ‘এরপর নাতিকে নিয়ে খালিশপুর ক্লিনিকে যাই। সেখানে বলা হয়, এখানে কোনো চিকিৎসক নেই। রোগী ভর্তি করা যাবে না। এরপর তাদের পরামর্শে রিফাতকে সার্জিক্যাল হাসপাতালে নেওয়া নিয়ে যাই। সেখানেও তাকে ভর্তি না নিয়ে ময়লাপোতার একটি হাসপাতালে পাঠানো হয়। তারাও রোগীকে ভর্তি না নিয়ে ফেরত পাঠান। এভাবে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মারা যায় রিফাত।’

খালিশপুর ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘লিভার সিরোসিস রোগীর জন্য আইসিইউ দরকার হয়। জটিল অবস্থায় থাকার কারণেই ওই রোগীকে ভর্তি  করা হয়নি। দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে সার্জিক্যাল হাসপাতালে রেফার করেছেন হয়তো। আমাদের ক্লিনিকের নিয়ম মেনে এটা হতেই পারে।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. শেখ আতিয়ার রহমান বলেন, ‘করোনা নিয়ে চিকিৎসকরা চাপের মধ্যে আছেন। তবে, সাধারণ রোগীরা যথাযথ চিকিৎসাসেবা পাবেন না, সেরকম পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। এ বিষয়ে আমি খোঁজ নিয়ে দেখবে।’

আর খুলনার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, ‘কেন রোগীকে যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হলো না, সে বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে দেখা হবে।’

তবে, রোগীদের সেবা  দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের নিরাপত্তাহীনতার কথা বললেন একটি নামকরা হাসপাতালের একজন চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘সরকারিভাবে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে পিপিই সরবরাহ করা হচ্ছে না। ফলে করোনা সংক্রমণের ভয়েই অনেকেই রোগী দেখতে চান না।’

রাজধানীর শ্যামলী এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিটে কাজ করেন ডা. ফারজানা রিমন। তিনি বলেন, ‘করোনা আসার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো পিপিই সরবরাহ করেনি।  পিপিইর অভাবেই অনেকে রোগী দেখতে চান না।’

এই বিষয়ে জানতে চাইলে প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘কোভিড-১৯-এর তিনটি স্তর আছে। প্রথম স্তরে উপসর্গ থাকতে পারে। দ্বিতীয় স্তরে উপসর্গ থাকবে। তৃতীয় স্তরে উপসর্গ থাকার পাশাপাশি অবস্থা খারাপের দিকে যাবে।’  তিনি আরও বলেন, ‘একজন সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষও করোনা ছড়াতে পারেন। এজন্য প্রতিটি হাসপাতালে ফিভার ইউনিট খোলা উচিত।’

এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘আমেরিকায় করোনা শনাক্তে র‌্যাপিড টেস্ট করার সুযোগ আছে। যা আমাদের এখানে নেই। ফলে করোনা সন্দেহ হলে আইইডিসিআরকে বলতে হচ্ছে। তারা এসে রোগীর নমুনা নিয়ে যাচ্ছে। এজন্য ঠাণ্ডা জ্বরে আক্রান্ত রোগী কোথাও গেলে তাকে করোনার জন্য বিশেষায়তি হাসপাতালে যেতে বলা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সর্দি জ্বরে আক্রান্তদের ট্রিটমেন্ট বাসায় থেকে ওভার ফোনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো এই বিষয়টি ঠিকমতো জনগণের মাঝে প্রচার করা হয়নি।’

এ সব অভিযোগের বিষয়ে  জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএস) ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ হয়েছে। সাধারণ জ্বর, সর্দিতে আক্রান্তরা চিকিৎসা পেতে বেগ পাচ্ছেন। তবে আমরা বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকগুলোতে ট্রিটমন্টে দিতে অনুরোধ জানিয়েছি।’ শিগগিরই এসব সমস্যার  সমাধান হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

  • সর্বশেষ - স্বাস্খ্য