ঢাকা, , ২৬ চৈত্র ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে

একজন যোদ্ধা, সর্বকালের সফল অধিনায়ক, সত্তিকারের টাইগার

একজন যোদ্ধা, সর্বকালের সফল অধিনায়ক, সত্তিকারের টাইগার

মানুষের জীবনে কঠিন সময় আসাটা খুব দরকার। কঠিন সময়ের কারণেই মানুষ সাফল্য উপভোগ করতে পারে। - ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে আব্দুল কালামের এ উক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবেন খুব কজনই।

সত্যিই তো যারা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন প্রত্যেকেই কঠিন সময় পাড় করেই তো সফলতার শীর্ষে গিয়ে পৌঁছেছেন।

সেই তালিকায় নিশ্চিতভাবেই থাকবেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। বাংলাদেশের ওয়ানডের সফলতম অধিনায়ক। ‘জীবনে সফল হতে চাইলে দু’টি জিনিস প্রয়োজন- জেদ আর আত্মবিশ্বাস।’– বিশ্বখ্যাত লেখক ও ঔপন্যাসিক মার্ক টোয়েন সফলতার মন্ত্র দিয়েছিলেন এভাবে। এ দুই গুণ রক্তমাংসে গড়া মাশরাফির ভেতরে টইটুম্বুর। নয়তো দুই পায়ে সাতটি অস্ত্রোপচার নিয়ে কি কেউ মাঠে দৌড়ায়! ২২ গজে বল ছোঁড়ে! ব্যাটিং করে দোর্দণ্ড  প্রতাপে!

মাশরাফি সব করছেন। দিব্যি করে যাচ্ছেন। মাশরাফির হাত ধরে বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেটে পেয়েছে সর্বোচ্চ সাফল্য। পেয়েছে বড়দের ক্রিকেটের একমাত্র ট্রফি। রঙিন জার্সিতে বাংলাদেশ এখন বলে কয়ে হারাতে পারে যে কাউকে, যেকোনো বড় প্রতিপক্ষকে। ২০১৫ বিশ্বকাপের আগে দলের দায়িত্ব পান মাশরাফি। এরপর পুরো দলকে পাল্টে দেন। পুরো দল হয়ে উঠে পরিবার। সাফল্য একসঙ্গে উপভোগ করে। ব্যর্থতা ভাগাভাগি করে নেয় সকলে। 

মাশরাফি প্রথমবার জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব পান ২০০৯ সালে। কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে নিজের প্রথম চ্যালেঞ্জ নিতে গিয়েই চোটে পড়েন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। দেশের বাইরে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ে দলকে নেতৃত্ব দেন তিনি। কিন্তু ওই টেস্টেই মাশরাফি ইনজুরিতে পড়ায় সিরিজের বাকি অংশে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেন সাকিব আল হাসান। পরে ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ে সিরিজ দিয়ে আবার অধিনায়কত্ব পান মাশরাফি। মুশফিকুর রহিমকে সরিয়ে সীমিত ওভারের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হয় মাশরাফির কাঁধে।

বর্তমান বাংলাদেশ দলের বদলে যাওয়ার সূচনা হয় ওই সিরিজেই। এরপর ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা, দেশে ফিরে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানকে টানা ওয়ানডে সিরিজে হারিয়ে বাংলাদেশ উঠে যায় অন্য উচ্চতায়। আইসিসি টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সেরা সাফল্য এসেছে মাশরাফির নেতৃত্বেই। ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের পর ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনাল খেলেছে বাংলাদেশ। ২০১৮ এশিয়া কাপেও দলকে তুলেছিলেন ফাইনালে। আবার কদিন আগে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছে, সেটাও মাশরাফির অধিনায়কত্বে।

মাশরাফির নেতৃত্বে বাংলাদেশের উল্ল্যেখযোগ্য অর্জন:

৮ জুলাই ২০১০ 

ইংল্যান্ডের মাটিতে ইংল্যান্ডকে হারানো। সেবারই প্রথম ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পায় বাংলাদেশ।

৫ অক্টোবর ২০১০

ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডকে হারায় বাংলাদেশ। ওই ম্যাচে মাত্র ১ ওভার বোলিং করতে পেরেছিলেন মাশরাফি। আবার ডানহাতি পেসার পড়েন ইনজুরিতে। 

২১ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর ২০১৪

জিম্বাবুয়েকে ৫-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ।

২০১৫ বিশ্বকাপ

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ বৈশ্বিক কোনো টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে। আফগানিস্তান, স্কটল্যান্ড, ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বাংলাদেশ নাম লিখায় শেষ আটে। নক আউটে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ হেরে বিদায় নেয় মাশরাফির দল।

পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তান নাস্তানাবুদ

ঘরের মাঠে টানা পাঁচ ওয়ানডে সিরিজ জেতে বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে ৩-০ ব্যবধানে, ভারতকে ২-১, দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-১, জিম্বাবুয়েকে ৩-০ এবং আফগানিস্তানকে ২-১ ব্যবধানে হারায় মাশরাফিবাহিনী। 

২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি 

বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বড় সাফল্য। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের পর বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে নাম লিখায়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বৃষ্টির কারণে পাওয়া পয়েন্ট ও নিউজিল্যান্ডকে উড়িয়ে সেমিতে যায় বাংলাদেশ। সেখানে ভারত বাধা পেরুতে পারেনি টাইগাররা।

২২ জুলাই থেকে ২৮ জুলাই ২০১৮

২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জেতে বাংলাদেশ।

২০১৮ এশিয়া কাপ

শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে টপকে বাংলাদেশ দুবাইয়ে এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠেছিল। কিন্তু এবারও বাংলাদেশের শিরোপার পথের বাঁধা ভারত।

৯ ডিসেম্বর থেকে ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয়।

২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ থেকে ১৭ মে ২০১৯

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ জেতে কোনো শিরোপা। আয়ারল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশ পায় শিরোপা।

২০১৯ বিশ্বকাপ

২০১৯ বিশ্বকাপ ব্যর্থতায় কেটেছে বাংলাদেশের। সেখানে বাংলাদেশের প্রাপ্তি দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো। প্রত্যাশিত জয় পায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে।

পরিসংখ্যান:

৮৭ ওয়ানডেতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মাশরাফি। পঞ্চাশ ভাগেরও বেশি তার সফলতা। জয়ের হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করতে প্রয়োজন মাত্র একটি জয়। ১৫টি দ্বিপাক্ষিক সিরিজের ১০টিতেই জিতেছেন মাশরাফি। হেরেছেন ৪টি, ড্র হয়েছে ১টি। তিনটি ত্রিদেশীয় সিরিজের ২টি হার, ১টিতে জয়।

প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে মাশরাফি

‘আমার ক্যারিয়ারটা অনেক আগে শেষ হয়ে যেতে পারত। যতোটুকু পেয়েছি আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া যে এতোটুকু আসতে পেরেছি। প্রাপ্তির বিষয়ে একজন খেলোয়াড়ের পক্ষে বলা খুব কঠিন। অপ্রাপ্তিটা খুব সহজেই বলতে পারা যায়।  অনেক অপ্রাপ্তি আছে, কিন্তু সেটাও দিন শেষে আমার কাছে প্রাপ্তি। কারণ একটা ফ্লোতে কখনোই জীবন চলে না। ভালো-খারাপের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। আমার ক্ষেত্রেও ওটাই হয়েছে। তবে সত্যি বলতে বলবো যে আমি এই দায়িত্বটাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে পালনের চেষ্টা করেছি। এখন প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি তো আসলে আপনারা-সমর্থকরা ভালো জানেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটা খোঁজার চেষ্টা করিনি কখনো।’

ক্রিকেটার মাশরাফি অনেক বড়। অধিনায়ক মাশরাফি আরও বড়। তার সাফল্য-ব্যর্থতা কিংবা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি হিসেবের খাতায় শুধু গোনার জন্যই মানায়। মাঠের বাইরে ও ভেতরে যে দলটাকে গুছিয়ে দিয়েছেন সেজন্য পুরো বাংলাদেশ হয়ে থাকবে অনুগৃহীত। ধ্রবতারা হয়ে তিনি স্বপ্ন সত্যি করেছেন। রংধনুর সাত রঙে রাঙিয়েছেন। এবার শেষ ক্যানভাসটাও রঙিণ করার অপেক্ষা।

  • সর্বশেষ - ক্রীড়াঙ্গন