ঢাকা, , ২৮ আষাঢ় ১৪২৭ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে

জিয়া - রণক্ষেত্র এবং রাজনীতির মঞ্চের মহানায়ক”

জিয়া - রণক্ষেত্র এবং রাজনীতির মঞ্চের মহানায়ক”

জানুয়ারি ১৯, আত্মমর্যাদাবান স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৮৪তম জন্মবার্ষিকী। বগুড়া জেলার গাবতলীর বাগবাড়ী গ্রামে জানুয়ারি ১৯, ১৯৩৬ সালে তাঁর শুভজন্ম। স্বাধীনতার মহান ঘোষক, রণাঙ্গনের অকুতোভয় যোদ্ধা, সাবেক সেনাপ্রধান, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক ও সাবেক প্রেসিডন্ট, জাতীয়তাবাদী নেতা — শহীদ জিয়া শুধু কি একজন ব্যক্তির নাম? না জিয়া শুধু একটি নাম নয় – একটি জাতিসত্তা, আদর্শ, ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠানও বটে।



 কিন্তু, একজন সৎ নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক ও দেশের গণমানুষের জাতীয়তাবাদী এই নেতাকে — সুযোগ পেলেই নানা ভাবে ছোট করার চেষ্টা হয়েছে। বাংলাদেশ বিভাজনের রাজনীতির বিয়োগান্ত শিকার হয়েছেন যে কয়েকজন, জিয়াউর রহমান তাদের একজন। জিয়া শেখ মুজিবুর রহমানকে নেতা মানতেন এবং সব সময় তার সর্ম্পকে ইতিবাচক কথা বলতেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে যথেষ্ট সম্মান দেয়নি, আমরা বীরের সম্মান দিতে জানি না।


কলকাতা ফোর্ট উইলিয়ামে বাংলাদেশের একজন মাত্র মুক্তিযোদ্ধার ছবি আছে, বুকের ওপর দু-হাত আড়াআড়ি করে দাঁড়ানো - তিনি জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান সেনানায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়েছিলেন। শহীদ জিয়ার জীবনীকে সৈনিক ও রাজনীতিবিদ দুই ভাবে পর্যালোচনা করা যায়। এখানে রণক্ষেত্র এবং রাজনীতির মঞ্চের মহানায়ক জিয়াকে নিয়ে কিছু তথ্য দেওয়ার প্রচেষ্টা।




তিনি ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে লাহোর সীমান্তে খেমকরন সেক্টরে কোম্পানী কমান্ডার হিসেবে ভারতের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে জয়লাভ করেন। এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে হিলাল-ই-জুররাত খেতাব লাভ করেন। ১৯৭১ সাল ২৫শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান বাসা থেকে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন। শেখ মুজিবের কাছ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার নির্দেশ পাননি কেউ এবং মুজিব নিজেও স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বারা জাতি আক্রান্ত হওয়ার পর সেই সঙ্কটময় মূহর্তে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার ভাষণটি বিভ্রান্ত ও নেতৃত্বহীন জাতিকে শক্তি, সাহস ও সত্যিকারের নিদকনির্দেশনা যোগায়।



 স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণার পাশাপশি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করেই দেশ স্বাধীন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন অগ্রগণ্য সেনানায়ক। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ১১ জন সেক্টর কমান্ডারের একজন ছিলেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে প্রথমে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন এবং চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, রাঙ্গামাটি, মিরসরাই, রামগড়, ফেনী প্রভৃতি স্থানে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। জুন হতে অক্টোবর পর্যন্ত যুগপৎ ১১ নম্বর সেক্টরের ও জেড-ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ৪৯ জন যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধাকে ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার সর্বোচ্চ বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করে।


তিনি তাঁদের একজন ছিলেন। কিন্তু তিনি সেক্টর কমান্ডার ও বীর উত্তম খেতাবধারীদের মধ্যেও অনন্য ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধের গবেষক মঈদুল হাসান লিখেছেন, ‘মেজর জিয়া কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে তাঁর প্রথম বেতার বক্তৃতায় (২৭ মার্চ সন্ধ্যা) নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করলেও পরদিন স্থানীয় নেতাদের পরামর্শক্রমে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন। এই সব ঘোষণা লোকের মুখে মুখে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ে, শেখ মুজিবের নির্দেশে সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালিরা স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই শুরু করেছে (মূলধারা ’৭১)। এরপর জিয়া চট্টগ্রাম যুদ্ধাঞ্চল, ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক এবং পরে জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে বহু আলোচিত যুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদান করেন।


যুদ্ধের শেষ ভাগে সিলেট অঞ্চলে তাঁর বাহিনীর কাছেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী যুদ্ধে তাঁর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম শক্তিশালী প্রভাবকের ভূমিকা রেখেছে, কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। কিন্তু তারপরও বিভিন্ন কারণে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার তাৎপর্য ছিল অন্য রকম। এ কে খন্দকার, মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান ২০০২ সালে এক স্মৃতিচারণায় বলেন, ‘যুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর একজন বাঙালি মেজরের কথা শোনা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। আমি নিজে জানি, যুদ্ধের সময় ও যুদ্ধের পরবর্তী সময়েও জানেছি যে মেজর জিয়ার এই ঘোষণাটি পড়ার ফলে সারা দেশের ভেতরে এবং সীমান্তে যত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সাংঘাতিক একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।


মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করল যে হ্যাঁ, এইবার বাংলাদেশ একটা যুদ্ধে নামল (এ কে খন্দকার, মঈদুল হাসান ও এস আর মীর্জা, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর: কথোপকথন)। জিয়ার ঘোষণায় উৎসাহিত বা উদ্দীপিত হয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম (মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি), এইচ টি ইমাম (বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১), অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের (আমার একাত্তর) মতো আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও। তাঁর ঘোষণার গুরুত্বের উল্লেখ আছে মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতের সক্রিয় কূটনীতিক জে এন দীক্ষিতসহ ট্রেভর ফিসলক, ডেভিড লুডেনের মতো বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তির ভাষ্যে (মাহফুজ উল্লাহ, প্রেসিডেন্ট জিয়া অব বাংলাদেশ)। তবে জিয়ার ঘোষণাটির অতুলনীয় প্রভাব পড়ে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে এটি দেওয়া হয়েছিল বলে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান ছিল অপরিসীম। স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করা ছাড়াও যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধ প্রশাসনের নীতিনির্ধারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মুক্তিযুদ্ধের সময়। জিয়া ছিলেন এই যুদ্ধে মহানায়কের মতো। আরও ছিলেন খালেদ মোশাররফ, আবু তাহের, আবু ওসমান, এম এ জলিল, রফিকুল ইসলামসহ অন্যান্য সেক্টর কমান্ডার। মুক্তিযুদ্ধ সর্বোপরি ছিল একটি জনযুদ্ধ, বহু সাধারণ মানুষের অসাধারণ আত্মত্যাগ আর শৌর্য–বীর্যের এক অনুপম গৌরবগাথা। বাংলাদেশের এই বীর সন্তানেরা ছিলেন অত্যুজ্জ্বল এক নক্ষত্রমণ্ডলীর মতো। সে নক্ষত্রমণ্ডলীর সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন বঙ্গবন্ধুই।


কিন্তু তাই বলে অন্য কোনো নক্ষত্রের আলোও ম্লান হতে পারে না, অন্য কোনো নক্ষত্রও মুছে যেতে পারে না। জিয়া আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের এমনই এক অবিনশ্বর নক্ষত্র (আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)। জিয়াকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সাথে শহীদ জিয়ার নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সুতরাং কখনোই স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ থেকে জিয়াকে বিচ্ছেদ করা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে অস্বীকার করা হলে দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকে অস্বীকার করা হবে। এটাই সত্য ও ইতিহাস।



১৫ই আগষ্ট শেখ মুজিবর রহমান সামরিক বাহিনীর মধ্যসারির অফিসারদের অভ্যুত্থানে নিহত হন। ক্ষমতার এই পটপরিবর্তনকে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ মেনে না নিয়ে ৩রা নভেম্বর কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটান। তারপর জিয়াউর রহমানকে চীফ-অফ-আর্মি স্টাফ হিসেবে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় এবং তাকে তাঁর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে গৃহবন্দী রাখা হয়। এরপর ৭ই নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের পর জেনারেল জিয়া রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। জিয়া হয়ে উঠেন একদলীয় শাসন ও ভিনদেশী ধিপত্যবিরোধী চেতনার মধ্যমণি এবং দেশের মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার একমাত্র ভরসাস্থল।

রাজনীতিবিদ হিসেবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের একটি দর্শন ও ভিশন দিয়েছিলেন।


বাঙালি, নানা উপজাতি এবং বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষের বিরোধ নিরসন করে একটি অভিন্ন জাতিসত্তা বাংলাদেশী পরিচিতি অর্জনের জন্য পরম ন্তরিকতায় জিয়া বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচনা করেন। নির্বাচন ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং অবাধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ প্রদানের লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান যত দ্রুত সম্ভব রাজনীতির গণতন্ত্রায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সেই লক্ষ্যে, শেখ মুজিবের আমলের শেষের দিকে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা দমন এবং বাকশাল রহিতকরণের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। অর্থনীতি পুনঃনির্মাণ করার জন্য অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে উদার অর্থনীতি গ্রহণ করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি তলাবিহীন ঝুড়ি নাম ঘুচিয়ে দেশকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কৃতিত্ব জিয়ার। তিনিই দেশে বেসরকারি খাত অর্থনীতির প্রতিষ্ঠাতা, র কেউ নয় যার সুফল ভোগ করছে জ দেশ। বাহাদুরি কুড়োচ্ছে দালাল। জিয়া সৈনিক ও রাজনীতিবিদ হিসেবে সকল ক্ষেত্রে একজন সফল মানুষ। সাধারনত একজন মানুষ বিশেষ একটি বিষয় পারদর্শী ও সফল হয়।


জীবনে সকল বিষয়ে সফল মানুষের সংখ্যা সমাজে বিরল। জিয়াউর রহমান ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। সকল ক্ষেত্রে সফলতার মুলে ছিল তার সততা, নিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিকে প্রশ্রয় না দেয়া, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, দুরদর্শিতা, মানুষকে আপন করে নেওয়া এবং সর্বপরি দেশপ্রেম।

শহীদ রাষ্টপতি জিয়াউর রহমানের জীবনযাত্রা এবং চলাফেরা ছিল খুবই সাধারণ, সাদামাটা ও নির্বিলাস। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ক্ষমতাধর ব্যাক্তি হওয়ার পরও তিনি নিজে ছোট গাড়িতে উঠতেন। জিয়াউর রহমান যে গাড়িটি ব্যবহার করতেন তাতে এসি ছিল না, এটা তেমন কোন দামি গাড়িও ছিল না। তাঁর নিরাপত্তার জন্য আজকের মতো আগে-পিছে, ডানে-বামে দামি গাড়ির বহর ছিল না। খুবই সাধারণ। সামনে শুধু একটি পুলিশের গাড়ি থাকত। একজন সার্জেন্ট আর তার সাথে কিছু পুলিশ। সম্প্রতি কালে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টরা চলাফেরার জন্য রাস্তা বন্ধ করে আগে-পিছে এবং ডানে-বামে নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি মাধ্যমে জনসাধারণের চূড়ান্ত ভোগান্তির দ্যশ্রাদ্ধ করে ন‌ির্বিকার চিত্তে। জাতীয় পার্টি দলীয় এমপি সাবেক মন্ত্রী মরহুম এ.কে.এম মাঈদুল ইসলাম মুকুল তার লেখা ‘আত্মসত্তার রাজনীতি এবং আমার ভাবনা’ শীর্ষক গ্রন্থে এসব কথা লিখেছেন।


তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কেবিনেটের সদস্য ছিলেন। এ.কে.এম মাঈদুল ইসলাম মুকুল আরও লিখেছেন, জিয়াউর রহমান সাহেব মন্ত্রীদের বলেছিলেন, আপনারা কখনও সিগন্যাল অমান্য করবেন না, আইন কানুন মেনে চলবেন। একবারের একটি কথা মনে আছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাজশাহী থেকে ঢাকা আসার উদ্দেশে সড়ক পথে রওনা হলেন। এডিসি সাহেব মারসিডিজ গাড়ি পাঠিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব গার্ড অব অনার নিয়ে ফিরে এসেই দেখেন যে সেখান মারসিডিজ গাড়ি প্লেস করা আছে। এটা দেখে তিনি এডিসি সাহেবের ওপর চটে গেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন এ গাড়ি কে পাঠিয়েছে? এডিসি সাহেব বললেন, এমএসপি সাহেব পাঠিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া রাগান্বিত হয়ে তার বেতনের টাকা থেকে গাড়ির তেলের টাকা কেটে রাখার নির্দেশ দিলেন। পরে তিনি ডিসি সাহেবকে তার গাড়িটি প্লেস করার কথা বললেন এবং ফেরিঘাটের রাস্তাটি দেখার জন্য ডিসি সাহেবের সেই ছোট গাড়িটি নিয়ে ঢাকার উদ্দে‌েশে রওনা দিলেন।


একদিন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেব কেবিনেট মিটিংয়ে মন্ত্রীদের উদ্দেশে বললেন, দেখেন আমি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট। আমার দেশ খুবই গরিব দেশ। পৃথিবীর সবাই তা জানে। আমাকে রিসিভ করার জন্য এতোগুলো লোক এবং এতো গাড়ি বিমানবন্দরে আসা যাওয়ার দরকার হয় না। এসব অপব্যয় বিদেশিরা দেখেন এবং তারা মনে করেন তাদের পয়সা দিয়ে এসব অপব্যয় করা হচ্ছে। রাত্রিবেলা আপনারা যখন আমাকে রিসিভ করে ফিরেন তখন মনে হয় যেন বিমানবন্দরে আগুন লেগে গেছে। সব লোক পালাচ্ছে। গাড়ির বহর একসাথে বের হচ্ছে। সুতরাং এখন থেকে শুধুমাত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী যাবেন।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী একজন সৎ দেশপ্রেমিক । শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রেস সচিব কাফি খানের চোখে জিয়া একজন সত্যিকারের সফল রাষ্ট্রনায়ক ও অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। এই জাতীয়তাবাদী নেতাকে মুহুর্তের জন্যও খাটো করে দেখার সুযোগ নাই। উঁচু দৃষ্টিতেই দেখতে হয়। সততায় জিয়া ছিলেন নজিরবিহীন। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত একজন সৎ মানুষ। কাফি খান তার ৮২ বছরের জীবনে এমন সৎ মানুষের সাক্ষাৎ কখনও পাননি। বছরের ৩৬৫ দিনই জিয়াউর রহমান কাজ করতেন। চার ঘন্টার বেশি রাতে ঘুমোতেন না। তার ব্যাটারি কি করে যে রিচার্জ হতো সে রহস্য আজও জানি না। জিয়াকে নির্দ্বিধায় বলব একজন কাজপাগল মানুষ।


কাফি খান ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রেস সচিব ছিলেন। তিনি এই চার বছর জিয়ার সান্নিধ্যে থেকেছেন, তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং দেখেছেন তার কাজ। এই জাতীয়তাবাদী বীর একজন ব্যাক্তিত্বসম্পুন্ন ও সাধারণ মানুষ ছিলেন, যার কাছে গেলে মনে হত তিনি খুব কাছের মানুষ। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি বলেন, তাঁর যে গুনাবলির সাথে মি পরিচিত হয়েছি, এক কথায় তা অতুলনীয়। জিয়াউর রহমানের কাজগুলো এখনও তার চোখে ভাসে। রাষ্ট্রপতি জিয়ার অভিধানে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি বলে কোন শব্দ ছিল না। দুর্নীতি সংক্রান্ত কোন কাজকে তিনি কখনও প্রশ্রয় দেননি। আত্মীয়স্বজনদের কেউ কোনো তদবিরের জন্য বঙ্গভবনে বা তার বাসায় সাক্ষাৎ করতে আসবেন, সেটা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার। তেমন সাহস কারও ছিল না। পরিবারের ক্ষেত্রেও তিনি একই নীতি অনুসরণ করতেন।


জিয়ার সততার তো তুলনাই হয় না। তার শত্রুও কোন দিন তার সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেননি। রাষ্ট্রপতি জিয়ার আরও একটি মহৎ গুণ ছিল তিনি দেশের শ্রেষ্ট সন্তানদের তার পাশে জড়ো করতে পেরেছিল। অধ্যাপক শামসুল হক, ড. এম এন হুদা, ডা. বি. চৌধুরী, সাইফুর রহমান, ড. ফসিউদ্দিন মাহতাব, তরুন চিকিৎসক ডামুজিবুররহমান মুজুমদার – এমন অনেক লোকের সমাগম ঘটেছিল তার সরকার ও দলে। দুরদর্শী চিন্তাভাবনার লোকের খোঁজ পেলেই তাকে তিনি বঙ্গভবনে চায়ের আমন্ত্রণ করেছেন এবং কোনো না কোনোভাবে কাজে লাগিয়েছেন। এক কথায় বলা যায়, তিনি ছিলেন প্রকৃতই জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক মানুষ। নিংসার্থ ভাবে দেশকে ভালোবাসা, দেশের জন্য কাজ করা, স্বজনপ্রীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়া, মানুষকে আপন করে নেওয়া, দিন রাত কাজ করা, সততার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করা, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা, দুরদর্শিতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা- এসব গুনাবলী কাফি খানকে শুধু মুগ্ধই করেনি, মনে হয়েছে জিয়ার মত যদি আরও কয়কজন দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী আদর্শের মানুষ পাওয়া যেত, তাহলে বাংলাদেশের চেহারাটাই পাল্টে দেওয়া যেত।



কিংবদন্তী উপন্যাসিক প্রয়াত হুমায়ন আহমেদ তার লেখা শেষ উপন্যাস দেয়ালে প্রেসিডেন্ট জিয়ার বিষয়ে উনি লিখেছেন – জিয়াউর রহমানের পাঁচ বছরের শাসনে প্রতি মাঘের শেষে বর্ষণ হয়েছিল কিনা তা কেউ হিসাব রাখেনি, তবে এই পাঁচ বছরে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়নি। অতি বর্ষণের বন্যা নয় , খরা নয , জলোচ্ছ্বাসও নয়। দেশে কাপড়ের অভাব কিছুটা দূর হলো। দ্রব্যমূল্য লাগামছাড়া হলো না। বাংলাদেশের নদীতে প্রচুর ইলিশ মাছ ধরা পড়তে লাগলো। বাংলাদেশের মানুষ মনে করতে লাগলো অনেক দিন পর তারা এমন এক রাষ্ট্রপ্রধান পেয়েছে যিনি সৎ। নিজের জন্য বা নিজের আত্নীয়স্বজনের জন্য টাকা পয়সা লুটপাটের চিন্তা তার মাথায় নেই। বরং তার মাথায় আছে দেশের জন্য চিন্তা। তিনি খাল কেটে দেশ বদলাতে চান। জিয়া মানুষটা সৎ ছিলেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই।


লোক দেখানো সৎ না, আসলেই সৎ। তার মৃত্যুর পর দেখা গেল জিয়া পরিবারের কোনো সঞ্চয় নেই (দেয়াল, পৃষ্ঠা-১৯৩)। আর বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা দিয়ে উনি লিখেছেন – ‘বঙ্গবন্ধু নিহতের ঘটনায় তার রাজনৈতিক সচিব ও রক্ষীবাহিনীর প্রধান তোফায়েল আতঙ্কে অস্থির। বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত রক্ষীবাহিনী ঝিম ধরে বসে আছে। রাস্তায় মিছিল বের হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, সেই মিছিল আনন্দ মিছিল। শফিক বাংলামোটরে গিয়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখল। সেখানে রাখা ট্যাংকের কামানে ফুলের মালা পরানো। কিছু অতি উৎসাহী ট্যাংকের উপর ওঠে নাচের ভঙ্গি করছে। আমার বাবর রোডের বাসার কথা বলি। বেতারে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবর প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে একতলার রক্ষীবাহিনীর সুবেদার পালিয়ে গেলেন। তার দুই মেয়ে ছুটে এল মায়ের কাছে। তাদের আশ্রয় দিতে হবে। মা বললেন তোমাদের আশ্রয় দিতে হবে কেন? তোমরা কি করেছ? তারা কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, খালাম্মা এখন পাবলিক আমাদের মেরে ফেলবে। এই ছোট্ট ঘটনা থেকে রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার এবং তাদের প্রতি সাধারন মানুষের ক্ষোভ ও ঘৃনাও টের পাওয়া যায়। (দেয়াল, পৃষ্ঠা-১০৭)।



সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্পর্কে মওলানা ভাসানীকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল — হুজুর আপনাকে তো সব সময়ই সরকার বিরোধী ভূমিকায় দেখা যায়। এমনকি যখন আপনার নিজের দল মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল, তখনও আপনি একই জনসভায় দাঁড়িয়ে আপনার পাশে বসা মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বক্তৃতা দিয়েছেন। অথচ দেখা যায়, আপনি জিয়াউর রহমানের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল। জিয়ার প্রতি আপনার এই দুর্বলতার কারণ কি? মাওলানা ভাসানী জবাবে বলেছিলেন - দেখ! তোমরা তো রাজনীতি দেখেছো বহুদিন ধরে, আমার রাজনীতির জীবনও অনেক দিনের। আমার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এদেশে এমন একটা লোক তো কখনও দেখলাম না যে ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে নিজেকে দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির ঊধের্ব রাখতে পেরেছে। আমাকে একটা উদাহরণ দেখাও? আসলে এমন সৎ ও যোগ্য দেশপ্রেমিক নেতা পৃথিবীর ইতিহাসে সত্যি বিরল (সূত্রঃ ভাষাসৈনিক অধ্যাপক আবদুল গফুর-এর লেখা)।



গুম-খুনধষর্ণ, শাসকদলের সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দুঃশাসন ও লুটপাটে দেশ এক গনতন্ত্রহীন বিছিন্ন দ্বীপে পরিনত হয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের এখন কোন নিরাপত্তা নাই, মানে রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। পক্ষান্তরে সাধারণ জনগন প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে। গনতন্ত্রহীন বর্তমান সংকটময় মুহুর্তে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে তার ৮৪তম জন্মবার্ষিতে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। এই মহান জাতীয়তাবাদী বীরকে আল্লাহ জান্নাত দান করুন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশের জাতীয় বীরদের সাহসিকতা ও মহত্বের কারণেই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ চার যুগেও টিকে আছে। আর কতদিন কিভাবে টিকবে, সে ভাবনা এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বছরে দুই দিনের জন্য জিয়াকে স্মরণ করা ভুল ও আত্মহত্যার শামিল।


তার কর্মজীবনকে আমরা মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারিনি, এটাই হল আমাদের বড় অপরাধ। এজন্যে শহীদ জিয়ার কোনো ক্ষতি হয়নি, ক্ষতি হয়েছে দেশ ও জাতির। যদি দেশ ও জনগনের ভাগ্যেরে পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আগে নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে। প্রত্যেককে জিয়া মত সৎ নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক হতে হবে। দেশ ও জনগণকে ভালোবাসতে হবে।

 

জাহিদ দেওয়ান শামীম

সিনিয়র সাইন্টিষ্টনিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি,( যুক্তরাষ্ট্র)

  • সর্বশেষ - বাংলাদেশ