ঢাকা, , ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে

ঢাবিতে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত সাবেক ছাত্রলীগের নেতারা,গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য

ঢাবিতে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত সাবেক ছাত্রলীগের নেতারা,গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ (জবি) রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে মাদকের। এসব সিন্ডিকেটের অনেকটির নেতৃত্বে রয়েছে ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা।


সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। দ্রুত এসব সিন্ডিকেটের সদস্যদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। যদিও ছাত্রলীগের ওই সব নেতারা মাদকের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।


প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন থেকে ক্যাম্পাসে অবস্থান করে মাদক ব্যবসা করে আসছে। তাদের টার্গেটে থাকে বিত্তবানদের ছেলেমেয়েরা। প্রথমে এসব ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে পরে কৌশলে তাদের ইয়াবায় আসক্ত করা হয়। নির্দিষ্ট চেইনের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য সরবরাহ করা হয়। ব্যবহার করা হয় মেসেঞ্জার ও ইমো। পুলিশি ঝামেলা এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে তারা অধিকতর নিরাপদ মনে করে।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের শেষের দিকে প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর অপর একটি গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে যাচাই করে তা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে পাঠানো হয়। পাশাপাশি প্রতিবেদনে থাকা মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়।


জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, অন্যান্য জায়গায় যেভাবে অভিযান চালাই, বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেভাবে অভিযান চালাতে পারি না। মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকাটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তাছাড়া তালিকা ধরে অধিদফতরের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে কিছু অভিযান চালানো হয়েছে।


এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাদকপ্রবণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিদের সঙ্গে শিগগিরই আমরা মতবিনিময়ে বসব। তাদের পরামর্শ নিয়েই অভিযান চালানো হবে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যারা মাদক ব্যবসায় নেতৃত্ব দিচ্ছে তারা হল-ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য ওয়াসিম ভূঁইয়া আলম, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আশিকুল পাঠান সেতু, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক দারুস সালাম শাকিল, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আপেল মাহমুদ সবুজ, বঙ্গবন্ধু হলের সাবেক সহ-সম্পাদক কামরুজ্জামান, সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ও বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাহিদুল ইসলাম সোহাগ, উপ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহাবুবুল ইসলাম, আপ্যায়ন সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম, সাবেক সহ-সভাপতি নাজমুল হক, সামসুন্নাহার হলের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি নিশিতা ইকবাল নদী, এসএম হলের সাবেক সভাপতি মেহেদী হাসান (প্রতিবেদনে শহিদুল্লাহ হলের সাবেক সভাপতি বলা হয়েছে), ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন অনু (অপহরণের অভিযোগে কিছুদিন আগে গ্রেফতার) ও সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এহতেশামুল আলম রুমি।


অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ও বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাহিদুল ইসলাম সোহাগ বৃহস্পতিবার বলেন, মাদকের সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই। ছাত্রলীগ নেতা ওয়াসিম আলম ভূঁইয়ার সঙ্গে আমার এক সময় ভালো সম্পর্ক ছিল। সে আমার বাইক নিয়ে মাঝে মধ্যেই সন্ধ্যার পর ২-৩ ঘণ্টার জন্য কোথায় যেন যেত।


এজন্য হয়তো তালিকায় আমার নামটি চলে এসেছে। ওয়াসিম আলম ভূঁইয়া মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিনা- জানতে চাইলে বলেন, ব্যবসা করে কিনা জানি না; তবে খায়-দায়।


অন্যদিকে ওয়াসিম আলম ভূঁইয়াকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, আমি এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে এসেছি। একটি ব্যাংকে চাকরি করছি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি কখনও মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম না। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে এ নিয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না।


এছাড়া অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন অনু বলেন, ক্যাম্পাসে আমার রাজনৈতিক অবস্থান নষ্ট করতে প্রতিপক্ষরা আমাকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে। এ কারণে তালিকায় আমার নাম এসেছিল। এখন ক্যাম্পাসে আমার নিয়মিত যোগাযোগ নেই। তারপরও আগের ধারাবাহিকতায় হয়তো আমার নামটি তালিকায় এসেছে।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রব্বানী বলেন, কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা হস্তান্তর করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। তবে মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা চালানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাইরে থেকে এসে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাদক ব্যবসা চালানোর অভিযোগ কারও বিরুদ্ধে থাকলে তাকে আইনের হাতে তুলে দিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সবসময় তৎপর।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হলসহ ক্যাম্পাসে ৬ জন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে। তারা হচ্ছে- ব্যবস্থাপনা বিভাগের ৭ম ব্যাচের মো. পারভেজ, ফিন্যান্স বিভাগের ৮ম ব্যাচের মো. সৌরভ, অর্থ বিভাগের ৯ম ব্যাচের মো. তুষন, ব্যবস্থা বিভাগের জুয়েল, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ১০ম ব্যাচের মো. সম্রাট আলম ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাফেটেরিয়ার কর্মচারী আনোয়ার হোসেন।


ঢাকা কলেজ এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীর তালিকায় দুইজনের নাম রয়েছে। তারা হল- দক্ষিণখানের ফরিদ মার্কেট এলাকার সবুজ আলীর ছেলে মো. মামুন ও ঢাকা কলেজ সদরগলির মো. পলাশ।


এ বিষয়ে টেলিফোনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোস্তফা কামালের বক্তব্য জানতে চাইল তিনি বলেন, আপনি অফিসে এলে বিস্তারিত কথা বলা যেতে পারে। টেলিফোনে কিছু বলা সম্ভব নয়।


রাজধানীর ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদক সরবরাহকারীর তালিকায় রয়েছে ধানমণ্ডি থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সুজাউদ্দিন তুহিনের নাম। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে মাদক ব্যবসায়ীর তালিকায় ধানমণ্ডি থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশফাক হোসেনের নাম রয়েছে এক নম্বরে।


এই ইউনিভার্সিটিতে অন্য যেসব মাদক কারবারি তৎপর, তাদের মধ্যে আছে- কাঁঠালবাগানের রাশেদুর রহমান, পান্থপথের মো. পাভেল, উত্তরা পূর্বাচলের রিপন মিয়া, উত্তরা পূর্ব থানা এলাকার শিবলু, গ্রিন রোডের মশিউল আলম সোহাগ ও ভূতেরগলির মো. জসিম।


জানতে চাইলে ধানমণ্ডি ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি আবদুল্লাহ আসিফ জয় বলেন, আগের কমিটিতে তারা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আমি ওই কমিটিতে সহ-সভাপতি ছিলাম। তাদের মাদক সংশ্লিষ্টতার কথা আমিও শুনেছি। তবে বিস্তারিত জানি না। তিনি আরও বলেন, তাদের মাদক সংশ্লিষ্টতার কারণে গত রমজান মাসে আমি নিজেও বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলাম।


ছাত্রলীগ নেতাদের মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের অবস্থান জিরো টলারেন্স। যদি কারও বিরুদ্ধে এ ধরনের তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।


গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্সটিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে মাদক ব্যবসায়ীর তালিকায় এক যুবলীগ নেতাসহ ৫ জনের নাম উঠে এসেছে। তারা হল- গণকটুলি কলোনির সুন্দর বাবুর স্ত্রী জামিলা, হাজারীবাগ থানা যুবলীগের সদস্য রাইসুল ইসলাম রবিন, কালোনগরের রাজিব, মাজার বটতলা এলাকার মো. সোহেল ও গজমহলের আলাউদ্দিন।


ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে মাদক ব্যবসা চালায় কলাবাগান লেনের রাশেদুর রহমান ও মো. পাভেল। তাদের গডফাদার হিসেবে গ্রিন রোডের মশিউর আলম সোহাগ ও কলাবাগানের ভূতেরগলির জসিমের নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে যাদের নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে তারা হল- উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের ১৩ নম্বর রোডের রিপন মিয়া, ৬ নম্বর সেক্টরের ঈশা খাঁ রোড এভিনিউয়ের শিবলু ও দক্ষিণখানের মো. মামুন।

  • সর্বশেষ - ক্যাম্পাস