শৈশব কেটেছে যে এতিমখানায় সে এতিমখানার জমি দখলের অভিযোগ কাউন্সিলর মানিকের বিরুদ্ধে

0
1167

নিজস্ব প্রতিবেদক(মাস্টার বিডি):-রাজধানীর লালবাগে গুরু ও শিষ্যের বিরুদ্ধে রয়েছে দখল-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজিসহ বিস্তর অভিযোগ। তারা হলেন হাসিবুর রহমান মানিক ও তার ‘গুরু’ মতিউর রহমান জামাল। আজিমপুরের অবৈধ বাস টার্মিনাল থেকেই তাদের নামে মাসে ওঠে কোটি টাকার চাঁদা। ঐতিহ্যবাহী স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার জমিতেও পড়েছে এই ‘গুরু-শিষ্যে’র নজর।

এছাড়া আজিমপুর লেডিস ক্লাবে‘বঙ্গবন্ধু মিনি সাফারি পার্ক’ স্থাপনের নামে গজার-পাঙ্গাশ-মাগুরসহ বিভিন্ন মাছ চাষের পাশাপাশি পোষা হচ্ছে টার্কি মুরগি, কবুতর ও রাজহাঁসসহ বিভিন্ন পশুপাখি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা, এলাকার একাধিক বাসিন্দা এবং লেডিস ক্লাবের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য। তবে চাঁদাবাজি-দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে কাউন্সিলর মানিক বলেন, এর প্রমাণ দিতে পারলে পদ থেকে সরে দাঁড়াব। আর এ বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে কল দিলে জামাল রং নাম্বার বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

মানিক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি ও লালবাগ থানার সাবেক সাধারণ সম্পাদক। আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন, গত একাদশ সংসদ নির্বাচনে মানিক দলের মনোনয়ন পেতে জোর চেষ্টা চালান। তার গুরু জামাল লালবাগ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি সংসদে সরকারদলীয় হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে আওয়ামী লীগের অর্থ ও পরিকল্পনা উপকমিটির সদস্য চট্টগ্রামের বিতর্কিত নেতা নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের শ্বশুর।

লালবাগ এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, মানিক-জামালের ক্যাডার বাহিনীর কাছে রয়েছে অবৈধ অস্ত্রের ভাণ্ডার। তারা প্রায়ই এলাকায় মহড়া দেন, চলাফেরা করেন ক্যাডারবেষ্টিত হয়ে। মানিক বর্তমানে যে বাড়িতে থাকেন সেটি সেলিম নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ডেভেলপার হিসেবে নিয়েছেন। সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন বাড়ির বাসিন্দারা।

এছাড়া বায়না করে সেলিমের চাচাদের কাছ থেকে নিয়েছেন পাশের বাড়িটিও। টাকার বিনিময়ে ৬/২ শেখশাহ বাজারে মুক্তিযোদ্ধা মিলন মৃধার বাড়িটি দখল করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মানিকের বিরুদ্ধে। জামালের মধ্যস্থতায় লালবাগের সেই সময়কার উপকমিশনার ইব্রাহিম খান ও ওসি মিলে বাড়িটি দখল করেন। পরে আরেক ঘটনায় ডিসি ইব্রাহিমকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ওসিকে বদলি করা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টারে গণপূর্ত বিভাগের অধীনে ছয়টি ২০ তলা ভবনে ৪৫৬টি ফ্ল্যাট ও প্রায় ৩০টি ২০ তলা ভবন নির্মাণসহ ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার কাজ চলমান। ভবন নির্মাণে সিমেন্ট ও পাথর সরবরাহ করে জামাল-মানিক সিন্ডিকেট। এছাড়া তারা কলোনির বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজের ঠিকাদারিও করেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আজিমপুর ইডেন কলেজ ও মেটারনিটি এলাকাটি যেন বাস টার্মিনালে পরিণত হয়েছে। দিন-রাত সেখানে রাখা হয় শত শত বাস। বাসের কর্মচারীদের অনেকের বিরুদ্ধে রয়েছে মাদক সেবনের অভিযোগ। এলাকাবাসী জানিয়েছে, এ টার্মিনালে ‘বিকাশ পরিবহনের’ টাকা ওঠে মানিকের নামে। আর অন্যান্য পরিবহনের টাকা ওঠে জামালের নামে।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতা বলেন, টার্মিনাল সরানো ও চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে তারা আবেদন করেছেন। ‘নাগরিক কমিটির ব্যানারেও’ আবেদন জানানো হয়েছে। কিন্তু এরপরও কিছু হয়নি। নাগরিক কমিটির এক সদস্য  বলেন, ‘এ এলাকায় ইডেন কলেজ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, অগ্রণী বিদ্যালয়, আজিমপুর হাই স্কুল, ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শাখা, আজিমপুর মাতৃসদনসহ বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব বিবেচনায় টার্মিনালটি সরিয়ে নেওয়া উচিত। পরিবহন সমিতিতেও অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। ’

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দখল-চাঁদাবাজি-টেন্ডার বাণিজ্যে মানিক-জামালের সহযোগী মাকসুদ ওরফে ইয়াবা মাকসুদ, হাতটাকা মিজান, মহসিন আজাদ, সাব্বির, মালেক, যুবলীগের জাফর আহমেদ রানা, তার ভাই রাশেদ কামাল ও বাদল। রানার বিরুদ্ধে আলীরঘাট এলাকায় বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে।

 

এতিমখানায় জীবন শুরু : মানিকের শৈশব কেটেছে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানায়। এতিমখানার নিরাপত্তাকর্মী আবদুল মজিদ বলেন, ‘আমি ২০ বছর আগে এখানে চাকরি নিই। চাকরির প্রথম দিকে মানিক এই এতিমখানার ছাত্র ছিল। ’ স্থানীয়রা জানিয়েছেন, একপর্যায়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন মানিক। তখন জামালের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। এই জামালের হাত ধরেই গত সিটি নির্বাচনে ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এরপর থেকেই দুজনে মিলে লালবাগে দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন।

এতিমখানার সম্পত্তিতে নজর : ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সলিমুল্লাহ এতিমখানার ৪০ কাঠারও বেশি জমিতে সম্প্রতি একটি আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ২২ তলা ভবন নির্মাণ শুরু করে। এ নিয়ে রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে ভবন নির্মাণ কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেয় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই সম্পত্তিতে নজর পড়েছে মানিক ও তার সহযোগীদের। তারা সুযোগ বুঝে এ সম্পত্তি দখলে নিতে চাইছে।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতা বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেকেই এ বিশাল সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছেন। এতিমখানাটি চলে সরকারি অ্যাডহক কমিটিতে। ওই কমিটি সম্পত্তি রক্ষায় কার্যকর ভ‚মিকা নিতে পারছে না।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সামনে মার্কেট দখলের চেষ্টা : লালবাগের ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সামনে ডিএসসিসির একটি মার্কেট রয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে এর ফুটপাতে দোকান তৈরির কাজ শুরু করেন মানিক। স্থানীয় লোকজন বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তোলে। পরে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে প্রতিবেদন প্রকাশের পর দোকানগুলো ভেঙে ফেলা হয়।

মন্দিরসংলগ্ন মার্কেটের দোকানিরা জানান, মার্কেট দখলের জন্য কাউন্সিলর মানিক দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছেন। তার লোকজন খালি জায়গায় জুয়ার আসর বসিয়েছে। পুনর্বাসন না করেই মার্কেট ভাঙার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দোকানিরা হাইকোর্টে রিট করেন। পরে আদালতের নিষেধাজ্ঞায় মানিকের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী বলেন, ১৯৮৫ সালে গণপূর্ত বিভাগ থেকে এসব দোকানের বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে মার্কেটটি সিটি করপোরেশনে ন্যস্ত হয়। মানিক কাউন্সিলর হওয়ার পর সেখানে ১২ তলা ভবন তৈরির চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজউকের গেজেটে রয়েছে, মন্দিরের ১২০ মিটারের মধ্যে বহুতল ভবন করা যাবে না। এ বিষয়ে দুটি মামলা রয়েছে। একটি মামলার রায় দোকানিদের পক্ষে।

লেডিস ক্লাবে মাছ ও পাখির চাষ : ১৯৫৬ সালে প্রায় এক একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় আজিমপুর লেডিস ক্লাব। সরকারি কোনো অনুমোদন ছাড়াই এই ক্লাবে মাছ চাষ ও পাখি পালন করছেন মানিক ও জামাল। ক্লাবের পেছনের অংশে বিশাল নেমপ্লেটে ওই খামারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু মিনি সাফারি পার্ক’। স্থানীয়দের অভিযোগ, জামাল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। তিনি ওই ক্লাবে পার্কের আড়ালে ইয়াবা ও ফেনসিডিল লুকিয়ে রাখেন এবং সেখান থেকে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেন।

ক্লাবের এক নারী সদস্য বলেন, সেখানে টার্কি ও দেশি মুরগি, হরিণসহ আরও অনেক পশুপাখি পোষা হতো। সম্প্রতি সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর পর সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কারা সেখানে পাখি পালন ও মাছ চাষ করছে জানতে চাইলে সেখানে দায়িত্বরত অফিসপ্রধান বলেন, সাফারি পার্কের নাম করে কাউন্সিলর মানিক ও আওয়ামী লীগ নেতা জামাল সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে পালন ও চাষ করছেন।

এর কোনো অনুমতি আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর কোনো অনুমোদনের কাগজপত্র ওই ক্লাবের কাছে নেই। মৌখিকভাবেই তারা সেটা করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পদাধিকার বলে ক্লাব সভাপতির দায়িত্বে থাকা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বদরুন্নেছার কাছে বলেন, বিষয়টি তিনি অবগত নন। খোঁজখবর নিয়ে জানাবেন।

 

কাউন্সিলরের বক্তব্য : চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিক। তিনি বলেন, ‘আমার নামে চাঁদাবাজি ও দখলের প্রমাণ দিতে পারলে কাউন্সিলরগিরি ছেড়ে দেব। এটা আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম।

যারা চাঁদাবাজি ও দখলের কথা বলে তারা আমার সামনে এসে বলুক। আমার এলাকায় গণপূর্তের ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ চলে। আমি ঠিকাদারের কাছ থেকে এক কাপ চা খেয়েছি এটা কেউ বলতে পারবে না। আমি মেয়রের হয়ে কাজ করি। মেয়র যেমন সৎ, আমিও তেমন সৎভাবে রাজনীতি করি। ’

এতিমখানায় বড় হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এতিমখানায় বড় হই আর রাস্তায় বড় হই কিংবা বাদাম বিক্রি করি এলাকার মানুষ আমাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছেন। আমি তাদের জন্য কাজ করছি। এই অবস্থায় বিএনপিসহ একটি কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে নানান অপপ্রচার ছড়াচ্ছে। ’

জামালের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে মানিক বলেন, ‘লালবাগ থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকার সময় থেকে আমি তাকে চিনি। আমার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। ’

সূত্র:-দেশ রূপান্তর

Print Friendly, PDF & Email